মহা সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান – Saptami Nabapatrika Snan
মহা সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান (Maha Saptami Nabapatrika Snan), সপ্তমী বিহিত পূজা প্রশস্তা: আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক বড় উৎসব।
যদিও প্রকৃত অর্থে উৎসব শুরু হয় ষষ্ঠীর দিন থেকে এবং দূর্গা পূজার পাঁচ দিন অর্থাৎ মহাষষ্ঠী (Maha Sasthi), মহা সপ্তমী (Maha Saptami), মহা অষ্টমী (Maha Ashtami), মহানবমী (Maha Nabami), এবং বিজয়া দশমী (Vijaya Dashami) এই দিনগুলি এই ভাবেই পরিচিত সকলের কাছে।
মহালয়া ও শ্রাদ্ধ – Mahalaya and Shraddhaপৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মহাষষ্ঠীর দিন দেবী দুর্গা তাঁর সন্তানদের নিয়ে অর্থাৎ গনেশ, লক্ষ্মী, কার্তিক ও সরস্বতী কে নিয়ে মর্ত্যে অবতরণ করেন।
মহাষষ্ঠীর দিন থেকে দুর্গার বোধন এর পর সমস্ত আচার অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায় এবং পুজো প্যান্ডেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্গা মন্দির এবং বনেদি বাড়িতে যে পূজা হয়ে থাকে সেখানে দুর্গার আরাধনা করা হয়, সর্বত্র ঢাকের তালে মেতে ওঠেন সকল মানুষ।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে আরো জানা যায় মহা সপ্তমীতে মহা পূজা করা হয়। সূর্য ওঠার আগেই একটি কলা গাছ পবিত্র গঙ্গার জলে স্নান করিয়ে তারপর এটিকে নববধূর মত করে সুন্দর শাড়ি পরিয়ে সাজানো হয়, যাকে চলতি ভাষায় কলা বউ বলা হয়।
কের পূজা – Ker Pujaমহা সপ্তমীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানান রীতিনীতি, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ এবং সকলের জানা একটি আচার অনুষ্ঠান হল নবপত্রিকা স্নান যাকে কলা বউ স্নানও বলা হয়।
তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক মহাসপ্তমীর পূজা বিধি এবং কলা বউ স্নান সম্পর্কে:
নবপত্রিকা স্নান/কলা বউ স্নান:
প্রচলিত ভাষা এবং গ্রামীণ ভাষায় নব পত্রিকার নাম হল কলা বউ, এই নবপত্রিকা স্নানকে অনেকে কলা বউ স্নানও বলে থাকেন এবং সূর্য ওঠার আগে একটি কলা গাছ পবিত্র গঙ্গার জলে স্নান করিয়ে তারপর এই এই কলা গাছকে নববধূ ওর মতো করে সাজানো হয় এবং আলতা পেড়ে শাড়ি পরানো হয়।
তারপর ঢাকের তালে খুবই আনন্দ উৎসবের মধ্যে দিয়ে প্যান্ডেল, মন্দির অথবা বনেদি বাড়িতে যেখানে দুর্গা উৎসব হয় সেখানে গণেশের ডান দিকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
নব পত্রিকার সাথে জড়িত নয়টি উদ্ভিদ:
নবপত্রিকা স্নান (Nabapatrika Snan) করানোর পর সেখানে নয়টি উদ্ভিদের ও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, এই কলা গাছের সাথে এই নয়টি উদ্ভিদের একত্রিতভাবে রেখে তবে এই কলা বউ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবপত্রিকা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো নয়টি গাছের পাতা, তবে বাস্তবে নবপত্রিকা নয়টি গাছের পাতা নয়, আসলে নয়টি উদ্ভিদ।
যে উদ্ভিদ গুলির মধ্যে রয়েছে কদলী অথবা রম্ভা যাকে কলা গাছ বলা হয়, বিল্ব অর্থাৎ বেল, কচু, হরিদ্রা অর্থাৎ হলুদ, জয়ন্তী, দারিম্ব অর্থাৎ দাড়িম, অশোক, ধান ও মান। এই উদ্ভিদ গুলি নবপত্রিকার সাথে বিশেষভাবে জড়িত।
নবপত্রিকা স্নানের নিয়ম:
একটি পাতাসহ কলা গাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্রিত করা হয় প্রথম পর্যায়ে। এরপর একজোড়া বেল সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধুর আকার দেওয়া হয় সেই কলা গাছটিকে। সিঁদুর পরিয়ে গণেশের পাশে অর্থাৎ দেবী দুর্গার ডানদিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয় নবপত্রিকা।
নবপত্রিকা পূজা কেন করা হয়?
শরৎকালে দূর্গা পূজার প্রচলন রামচন্দ্রের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বলে এমনটাই সকলেই জানি। যদিও মূল বাল্মিকী রামায়নে রাবণ বধের আগে দুর্গাপূজার কোন উল্লেখ নেই, তবে চণ্ডীতে উল্লেখ আছে শরৎকালের এক মহা পূজার কথা। সেখানে দেবী মাহাত্ম্য পাঠের উল্লেখও রয়েছে কিন্তু পূজাটি সঠিক যে কি, তা স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
এই পূজাই হলো নবপত্রিকা পূজা (Nabapatrika Puja), আসলে এই পূজা সাকার মূর্তির উপাসনা ছিল না, তখন মানুষের ধর্ম আচরণের সঙ্গী ছিল, এই উৎসব অরণ্য জীবন তখন মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল।
আর তাই মানুষ উৎসবে এই প্রয়োজনে উদ্ভিদ ও শস্যকে কখনোই বাদ দিয়ে উৎসব করত না। ইতিহাসের দিক দিয়ে দেখলে দেখা যায় অনেক জাতির ক্ষেত্রেই শীতের আরম্ভে উদ্ভিদ নিয়ে এরকম অনেক উৎসব রয়েছে, যে উৎসবে তারা নিজের মন মতো একটা লোকপ্রথা প্রচলিত অনুসারে আনন্দে ভেসে যান। এরকম উৎসবে মেতে উঠার প্রথা দেখতে পাওয়া যায় বহু।
এখানেও কিন্তু ছিল তাই, তাই সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই শস্য পূজা বা উদ্ভিদ পূজা রীতির সঙ্গে দেবীর মাহাত্ম্য যুক্ত হয়েছে। এক একটি উদ্ভিদের সঙ্গে দেবীর এক একটি রূপের বর্ণনা করা যায়।
আর সেই প্রাচীন নবপত্রিকার আরাধনা অঙ্গীভূত হয়েছে দুর্গার অকালবোধনের সঙ্গে। এই রীতি তাই আজও সাক্ষ্য বহন করে যে আমাদের অতীত উৎসবের বিষয়বস্তুকে সাক্ষ্য দেয় সেই বিবর্তনেরও।
যেখানে সময়ের সাথে সাথে এই পৃথিবীকে শস্যশ্যামলা হিসেবে দেখতে মানুষ খুবই পছন্দ করে। সেই কারণে শস্যকে বাদ দিয়ে কোন উৎসবই যেন উদযাপন করাই যায় না।