তাই পোঙ্গল উৎসব পালন (কেরল) – Thai Pongal

তাই পোঙ্গল উৎসব পালন (কেরল) – Thai Pongal

তাই পোঙ্গল উৎসব পালন, কেরল – (Thai Pongal): এই উৎসবটি এমন একটি উৎসব যে উৎসবে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সংশয় অর্থাৎ এটিকে অনেকে তামিলনাড়ুর পোঙ্গল উৎসব এবং কেরলের ওনাম /তাই পোঙ্গল উৎসবের সাথে গুলিয়ে ফেলেন।

আসলে এই তাই পোঙ্গল উৎসবটি (Thai Pongal Festival) সম্পূর্ণ আলাদা যা শস্য রোপন করার একটি উৎসব। এই উৎসবটি ঘিরে কেরলের বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন এবং আনন্দ উপভোগ করে থাকেন।

শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ ব্রত পালন পদ্ধতি – Satyanarayan Vrat Vidhi

তাই পোঙ্গল উৎসব:

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক কেরলের তাই পোঙ্গল উৎসব সম্পর্কে:

এই উৎসবের দিন সমস্ত প্রজা গৃহে উপস্থিত হন বলি রাজা। তাঁর আগমনে কেরালবাসী তাঁদের বাড়ির দরজায় ফুলের আলপনা দিয়ে থাকেন। আয়োজন করে থাকেন ২৬ পদের রান্না, সকলেই নতুন বস্ত্র অথবা কাপড় পড়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন এবং সকলের বাড়িতে গিয়ে এই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন।

তাই পোঙ্গাল উৎসব পালন করার নিয়ম:

টানা ১০ দিনের উৎসবের মধ্যে প্রতিটি দিনের গুরুত্ব রয়েছে অপরিসীম এবং আলাদা আলাদা ঐতিহ্য বহন করে। প্রতিটি দিন বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন করার মধ্য দিয়ে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

শ্রী শ্রী মনসা পূজা – Manasa Puja

১) প্রথম দিন ‘থিরিকারা’ মন্দিরে উৎসবের সূচনা হয়।

২) দ্বিতীয় দিন সকালে ঘর-দোর পরিষ্কার করে রং করে আলোর মালা দিয়ে বাড়িঘর সাজানো হয়, আর এর নাম ‘চিথিরা’

৩) তৃতীয় দিন “চোধি”, এই দিনে নতুন জামা কাপড় ও আপনজনদের জন্য উপহার কেনা করা হয়। পুরুষদের পোশাক সাদা সিল্কের লুঙ্গি এবং সঙ্গে সোনালী বা রঙিন জামা আর সাদা সিল্কের শাড়ি সোনালী বর্ডার দেওয়া যা নারীদের পোশাক।

৪) চতুর্থ দিন হল ‘ভিসাকাম’, এই দিন দুপুরে যে সমস্ত পদ রান্না করা হয় সেগুলি নিচে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ইডলি, ধোসা এবং বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক ব্যঞ্জন যা খাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন অনেকেই। দূর দূরান্তর থেকে অনেকেই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন এই চতুর্থ দিনে।

৫) পঞ্চম দিনের নাম ‘আনিঝাম’, নদী নালার রাজ্য কেরলের প্রাণের আবেগ কেন্দ্রীভূত হয় নৌকা বাইচের প্রতিযোগিতায়। এই দিনটি এই উৎসবে প্রচুর মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো।

৬) ষষ্ঠ দিনের উৎসবটি ‘থিরিকেটা’ নামে পরিচিত। এই দিনটি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সময় কাটানোর দিন। অনেকে নিজেদের পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানাতে পুরনো জন্ম ভিটা পরিদর্শন করতে যান এবং সেখানে গিয়ে পরিবারের মানুষদের সাথে সময় কাটান।

৭) সপ্তম দিনটি নাচ গান দিয়ে মেতে ওঠার দিন, এই উৎসবের নাম হলো ‘মূলাম’। এই দিনে মেয়েরা কেরালার বিখ্যাত লোকনৃত্য “কায়কোট্টিকলি” নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে। পৌরাণিক নানা চরিত্রে অভিনয় করা হয় বিভিন্ন দক্ষ শিল্পীদের দ্বারা। এছাড়া এই দিনটি শুধুমাত্র উৎসব, অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ গানের মধ্যে দিয়ে উদযাপন করা হয়।

৮) অষ্টম দিনের নাম ‘পুরাদম’, আলপনার মাঝে বসানো হয় বলি রাজা ও বামন অবতারের ছোট মূর্তি। তাঁদের এইভাবেই নিজের ঘরে বলি রাজা অর্থাৎ তাঁদের “ওনাথাপ্পান” কে আনুষ্ঠানিকভাবে আপ্যায়ন করে থাকেন কেরলবাসী।

৯) নবম দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এই দিনটি ওনাম সন্ধ্যা যার নাম ‘উথরাদম’। এই দিনে বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়। আনন্দ আহ্লাদে কাটে এই দিনটি, রাজা বলি রাজ্য ভ্রমণে বেরিয়ে সমস্ত প্রজাকে আশীর্বাদ করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

১০) দশম দিন অর্থাৎ এই উৎসবের শেষ দিনটি হল ‘থিরুভুনাম’। উৎসবের সমাপ্তির দিন সকাল সকাল স্নান করে নতুন পরিষ্কার বস্ত্র পরে নতুন করে আলপনা দেওয়ার প্রথা রয়েছে, সন্ধ্যায় সমস্ত রাজ্য জুড়ে আলোকসজ্জা ও আতশবাজির আয়োজন করা হয়।

এই উৎসবে যে সমস্ত পদের রান্না হয়:

  • কাঁচা আমের আচার,
  • নোনতা কলা ভাজা,
  • গুড় মাখানো মিষ্টি কলা ভাজা,
  • লেবুর আচার,
  • লাউ লাল বিন ও নারকেলের তরকারি,
  • দই ও নারকেলের তরকারি,
  • কাঁচকলা দিয়ে দইয়ের ব্যঞ্জন,
  • নারকোলের দুধ দিয়ে ছাঁচি কুমড়োর তরকারি,
  • আনারস ও দই দিয়ে উছে,
  • নারকেল তেলে ভাজা বড় বড় শিম,
  • আদা তেঁতুল ও গুড়ের চাটনি,
  • শুকনো লঙ্কা ও তিল ফোড়ন দেওয়া মুগ ডাল,
  • লাল চালের আঠালো ভাত,
  • সম্বার,
  • রায়তা,
  • চালের পাপড় ভাজা,
  • দুধ ও নারকেল তেলে রান্না করা মিক্সড সবজি,
  • মসলাদার তরকারি,
  • কাঁচকলা ও নারকেল কোরা দিয়ে রান্না করা খোসা সমেত ডাল,
  • রসম,
  • ঘি,
  • মিহি আদা কুচি দেওয়া মসলাদার চাটনি,
  • পায়েসের সঙ্গে মেখে খাওয়ার জন্য ছোট কলা,
  • দুধ, চালের গুঁড়ো, শুকনো ফল দিয়ে তৈরি করা মিষ্টি জাতীয় খাবার,
  • চালের গুঁড়ো, কাজুবাদাম, মিহি নারকেল কুচি, গুড় দিয়ে তৈরি করা মিষ্টি ইত্যাদি। আর এই রান্নার পদ গুলি সত্যিই একবার হলেও চেখে দেখার সুযোগ হওয়াটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।

✨ কেরলের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও এই মহোৎসবে শামিল হয়ে থাকেন। তাঁরা মোমবাতি জ্বালিয়ে বাইবেলে ফুল বর্ষণ করেন একে বলে “নীলাভিলাক্কু”। এছাড়া হিন্দুদের সঙ্গে একসাথে বসে আহারও করে থাকেন। এই সামাজিক সম্প্রীতি ‘ওনাম’ উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসবে খুশির জোয়ারে গা ভাসিয়ে থাকেন বিভিন্ন ধর্মের মানুষ।

তাই নানা দুঃখ, কষ্ট ভুলে বারবার এই উৎসবে মেতে ওঠেন কেরলবাসী। আর এই উৎসবে সকলের সমাবেশ দেখে মনে হয় যে এখানেই মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধন সত্যিই সার্থক। “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”