গঙ্গাসাগর মেলা ও পূণ্য স্নান – Gangasagar Mela
গঙ্গাসাগর মেলা ও পূণ্য স্নান (Gangasagar Mela): শীতের আমেজে চারদিকে যখন কুয়াশা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে তখন বিভিন্ন দিকে মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি মকর সংক্রান্তি অথবা পৌষ সংক্রান্তির (Poush Sankranti) মেলা প্রতিবছর বিভিন্ন জায়গায় খুবই বড় আকারে অনুষ্ঠিত হয়। তার পাশাপাশি গঙ্গাসাগর মেলা খুবই জনপ্রিয় হিন্দুধর্মে।
গঙ্গাসাগর মেলাতে সকলে গিয়ে সেখানে ব্রত উপবাস পালন করে গঙ্গায় পূণ্য স্নান করে পূণ্য অর্জন করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। গঙ্গাসাগরে তীর্থযাত্রা ও স্নানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রতিবছর এখানে পৌঁছে যান এবং মোক্ষ প্রাপ্তি কামনা করে সাগর সঙ্গমে পবিত্র স্নান সম্পন্ন করেন।
শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ ব্রত পালন পদ্ধতি – Satyanarayan Vrat Vidhiমকর সংক্রান্তিতে (Makar Sankranti) গঙ্গা যমুনার তীরেও বিরাট বড় মেলা বসে, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত থেকে পর্যটক এখানে এসে পৌঁছান। তারপর পূণ্য স্নান, জপ, তপ, দান কর্ম, তর্পণ ইত্যাদি করে থাকেন পূন্যার্থীরা।
অনেকের মুখেই হয়তো শোনা যায় যে, “সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার”, জীবনে একবার হলেও গঙ্গাসাগরে গিয়ে পূণ্য স্নান সম্পন্ন করাটা খুবই পুণ্যের বলে বিশ্বাস করা হয়।
গঙ্গাসাগরের মিলনস্থল ও গঙ্গাসাগর মেলা:
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে স্নান করলে সমস্ত পাপ বিনাশ হয় এবং অনন্ত পূণ্য লাভ করা যায়। এছাড়াও প্রতি মকর সংক্রান্তিতে এখানে স্নান করলে মোক্ষ লাভ হয় বলে প্রচলিত বিশ্বাস চলে আসছে প্রাচীনকাল থেকে।
রান্না পূজার পদ্ধতি ও নিয়ম – Ranna Pujaতাছাড়া এই মেলা উপলক্ষে এবং এই তিথিতে সূর্যদেবকে নৈবেদ্য দেওয়া হয় এবং ভক্তরা সমুদ্রে নারকেল এবং পূজা সম্পর্কিত বিভিন্ন উপকরণ নিবেদন করে থাকেন। বিশ্বাস করা হয় যে, মকর সংক্রান্তিতে পূণ্যস্নান করলে সমস্ত মনের ইচ্ছা পূরণ হয় এবং সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে আসে সংসারে এবং জীবনে।
গঙ্গাসাগরের মেলা বসে হুগলি নদীর তীরে। যেখানে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে, যেখানে গঙ্গা ও সাগর মিলিত হয় সেই স্থানটির নাম গঙ্গাসাগর।
গঙ্গাসাগর মেলা পূজার উপকরণ:
- লাল কাপড়,
- লাল ফুল ও ফল,
- গুড়,
- কালো তিল,
- একটি তামার পাত্র,
- ধূপ,
- প্রদীপ,
- কর্পূর,
- লাল চন্দন,
- নৈবেদ্য,
- সূর্য চালিশার বই,
- আদিত্য হৃদয় স্তোত্র,
- সূর্য আরতি,
- গম,
- ঘি,
- দানের জন্য গরম কাপড়, কম্বল, খিচুড়ি, শস্য ইত্যাদি।
গঙ্গাসাগর পূণ্য স্নানের বিভিন্ন নিয়ম:
যদি কোন ব্যক্তি গঙ্গাসাগরে গিয়ে এই পুণ্য স্নান সম্পন্ন করতে না পারেন তাহলে ব্রহ্ম মুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে বাড়িতেই স্নানের জলে গঙ্গাজল ও কালো তিল মিশিয়ে স্নান করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে স্নান করলে পূণ্য লাভ করতে পারেন, এইভাবে গঙ্গা স্নান করলে দেবী গঙ্গার কৃপায় পাপ মোচন হতে পারে, অনন্ত পূণ্য লাভ করতে পারবেন আপনি।
গঙ্গাসাগর মেলা পূজার পদ্ধতি:
১) মকর সংক্রান্তিতে স্নান করে পিতৃ পুরুষকে তর্পণ অর্পণ করতে হবে।
২) কুশের অগ্রভাগ থেকে জল ফেলে দিলে তা পূর্বপুরুষদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
৩) পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে নৈবেদ্য দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করুন।
৪) তারপর একটি পাত্রে জল দিয়ে পূর্ণ করে তাতে লাল চন্দন, লাল ফুল ও গুড় যোগ করুন।
৫) এরপর সূর্য মন্ত্র জপ করার সময় সূর্যদেবকে প্রণাম করুন।
৬) এরপরে সূর্য চালিশা, আদিত্য হৃদয় স্তোত্র পাঠ করতে হবে।
৭) তারপর কর্পূর জ্বালিয়ে, ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে সূর্য দেবতার আরতি করুন।
৮) ভক্তদের নিজস্ব রাশি অনুযায়ী সূর্যদেব ও অন্যান্য গ্রহের দোষ কাটাতে দান করুন গুড়, তিল, গম, কম্বল, সপ্তধন, শীতের জন্য গরম বস্ত্র, খিচুড়ি, উরদ ডাল ইত্যাদি।
৯) এছাড়া আপনার সাধ্যমত গরীব দুঃখীদের কিছু দান করুন ও ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা দিয়ে সন্তুষ্ট করুন।
মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগর মেলার পৌরাণিক তাৎপর্য:
সারা বছর তো পড়ে রয়েছে অনেকটা তিথি তবুও কেন মকর সংক্রান্তিতেই গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হয় ? এই প্রশ্ন থাকতেই পারে, তাই না ! মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরের স্নানের পৌরাণিক তাৎপর্য রয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মা গঙ্গা যখন ভগবান শিবের জটা থেকে পৃথিবীতে পৌঁছেছিলেন তখন তিনি ভগীরথকে (নদী) অনুসরণ করেছিলেন আর কপিল মুনির আশ্রমে গিয়ে সমুদ্রে মিলিত হয়েছিলেন, সেই দিনটি ছিল মকর সংক্রান্তির দিন। রাজা সাগরের ষাট হাজার অভিশপ্ত পূত্ররা মা গঙ্গার পবিত্র জল পেয়ে রক্ষা পেয়েছিলেন।
এই ঘটনাকে স্মরণ করে এই তীর্থ গঙ্গাসাগর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে, আর এই পবিত্র স্থানটি প্রতিবছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে গঙ্গাসাগর মেলার আয়োজনে সেজে ওঠে। অনেক পুরনো বিশ্বাস অনুসারে এই শুভ দিনে স্নান করলে ১০০ টি অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সমান পূণ্য অর্জন করা যায়।